একটি একতরফা প্রেমের দীর্ঘ স্বীকারোক্তি
আকাশে সেদিন মেঘ ছিল না, তবু আমার ভেতরের আকাশে এক অদ্ভুত কুয়াশা নেমে এসেছিল। মানুষের ভিড়ের মাঝেও আমি একা ছিলাম—কারণ আমার বুকের ভেতর যে নামটি প্রতিদিন নীরবে জেগে উঠত, সে নামের অধিকারিণী জানতই না, কেউ একজন তাকে নিঃশব্দে ভালোবেসে ফেলেছে।
আমি তাকে প্রথম দেখেছিলাম বর্ষার বিকেলে। কলেজের পুরোনো ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল সে, হাতে একটি বই। বাতাসে তার চুল উড়ছিল—যেন কোনো অজানা সুরের ছন্দে নেচে উঠেছে। সে হাসছিল, হয়তো বন্ধুর কোনো কথায়; অথচ সেই হাসি আমার হৃদয়ের ভেতর গিয়ে অদ্ভুত এক আলো জ্বেলে দিয়েছিল।
সেদিন বুঝিনি, সেটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম নিঃশব্দ পতন—ভালোবাসার গভীর খাদে।
প্রথম পরিচয়, অচেনা দূরত্ব
আমাদের মধ্যে পরিচয় ছিল, তবে খুব সাধারণ। একই ক্লাসে পড়তাম, মাঝেমধ্যে নোট নেওয়া-দেওয়া হতো। তার চোখে আমি ছিলাম আর দশজনের মতোই একজন—নাম জানা, মুখ চেনা, তাতেই শেষ।
কিন্তু আমার কাছে সে ছিল অন্যরকম।
তার কথা বলার ভঙ্গি, হঠাৎ থেমে যাওয়া, চিন্তায় ডুবে থাকা—সবকিছুই আমার মনে এক অদ্ভুত সুর তোলে।
আমি তাকে কখনো বলিনি—
“তোমার হাঁটার শব্দে আমার সকাল জেগে ওঠে।”
কখনো বলিনি—
“তুমি না থাকলে এই ভিড়ের মাঝেও আমি শূন্য হয়ে যাই।”
কারণ আমি ভয় পেতাম। ভয় পেতাম তার সরল চোখে কোনো অস্বস্তি দেখতে। ভয় পেতাম, সে যদি হেসে বলে—
“তুমি এসব ভাবলে কবে?”
নীরব ভালোবাসার দিনগুলি
ভালোবাসা যখন একতরফা হয়, তখন তা এক অদ্ভুত সাধনার মতো হয়ে ওঠে।
আমি প্রতিদিন তাকে দেখতাম—কখনো লাইব্রেরির কোণে, কখনো মাঠের ধারে। দূর থেকে দেখেই মন ভরে যেত।
সে হয়তো ভাবত, আমি কেবল বইপোকা একজন ছেলেমানুষ।
কিন্তু সে জানত না—তার পছন্দের কবিতার বই আমি পড়তাম, শুধু তাকে একটু ভালো বুঝবো বলে।
তার জন্মদিনে আমি একটি ছোট্ট কার্ড কিনেছিলাম। লিখেছিলাম—
“তোমার হাসি যেন চিরকাল এমনই থাকে।”
নাম লিখিনি। সাহস হয়নি। কার্ডটি শেষ পর্যন্ত আমার ডায়েরির ভাঁজেই থেকে গেল।
ভালোবাসা যখন বলা হয় না, তখন তা কাগজের ভাঁজে, চোখের কোণে, নিঃশ্বাসের ভেতর আশ্রয় নেয়।
একদিন সে বলল…
এক বিকেলে সে খুব উচ্ছ্বসিত ছিল।
আমাকে বলল—
“জানো, আমার জীবনে একজন এসেছে। খুব ভালো মানুষ।”
তার চোখে যে দীপ্তি দেখেছিলাম, তা আমার বুকের ভেতর ঝড় তুলেছিল।
আমি হাসলাম। বললাম—
“ভালো কথা।”
সেই হাসি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিনয়।
সেদিন বুঝলাম, ভালোবাসা মানেই পাওয়া নয়।
কখনো কখনো ভালোবাসা মানে দূর থেকে তার সুখ দেখে চুপচাপ সরে যাওয়া।
অস্বীকারের পর স্বীকারোক্তি
আমি বহুবার নিজেকে বলেছি—
“এ কেবল এক মোহ, কেটে যাবে।”
কিন্তু ভালোবাসা কি এত সহজে মুছে যায়?
রাতে যখন জানালার পাশে বসতাম, তার কথা মনে পড়ত।
ভাবতাম, যদি একদিন সাহস করে বলতাম—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি”—
তাহলে কি কিছু বদলাত?
হয়তো বদলাত না।
হয়তো সে অবাক হতো, হয়তো দূরে সরে যেত।
তবু আজও মনে হয়, বলা উচিত ছিল। কারণ না বলা ভালোবাসা চিরকাল একটা অসমাপ্ত বাক্যের মতো থেকে যায়।
বিদায়ের দিন
কলেজ শেষ হলো।
সবাই যার যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেল।
সেদিন শেষবারের মতো তাকে দেখেছিলাম স্টেশনে। হাতে তার ছোট্ট ব্যাগ। চোখে স্বপ্নের আলো।
আমি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে আমাকে দেখেই হাত নেড়ে বলল—
“ভালো থেকো।”
আমি মাথা নেড়ে হাসলাম।
সে জানত না—
এই দুই শব্দ আমার ভেতরে কতখানি শূন্যতা রেখে গেল।
ট্রেন চলে গেল।
প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা হলো।
আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম—যেন কোনো গল্পের শেষ পৃষ্ঠা উল্টাতে ভুলে গেছি।
আজও কেন মনে পড়ে?
বছর কেটে গেছে।
জীবন আমাকে অনেক দূর নিয়ে এসেছে।
তবু কখনো বর্ষার গন্ধ পেলে, বা কোনো মেয়ের হাসিতে সেই পুরোনো সুর শুনলে, তার কথা মনে পড়ে যায়।
আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম—
সে জানতই না।
এই না-জানা ভালোবাসার মধ্যেই হয়তো এক ধরনের পবিত্রতা ছিল। কোনো দাবি ছিল না, কোনো প্রত্যাশা ছিল না। ছিল শুধু নিঃশব্দে তার সুখ কামনা করা।
ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ
আজ বুঝি—
ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়।
ভালোবাসা মানে তার ভালো থাকা কামনা করা, এমনকি সে যদি অন্য কারও হাত ধরে চলে যায় তবুও।
আমার জীবনে সে এক অধ্যায় ছিল—অসমাপ্ত, অথচ গভীর।
সে জানত না, কেউ একজন তাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনেছিল।
সে জানত না, তার একটি হাসি কারও রাত জাগা কবিতার জন্ম দিয়েছিল।
হয়তো কোনোদিন সে জানতে পারবে না।
তবু তাতে কী আসে যায়?
কারণ ভালোবাসা সবসময় শব্দে প্রকাশ পায় না—
কখনো কখনো তা নীরবতাতেই সবচেয়ে সত্য হয়ে ওঠে।
শেষ কথা
যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়,
আমি হয়তো শুধু বলবো—
“তুমি ভালো থেকো।”
আর মনে মনে যোগ করবো—
“আমি তোমাকে একদিন খুব ভালোবেসেছিলাম, তুমি জানতেই না।”
💔 একতরফা প্রেম কষ্ট দেয়, কিন্তু সেই কষ্টেই এক ধরনের নির্মল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।


Leave a Reply