শেষ মেসেজটা ছিল — “ভালো থেকো”

সন্ধ্যার আকাশে সেদিন অদ্ভুত এক রং লেগেছিল। না সে পূর্ণ সূর্যাস্তের লালিমা, না সম্পূর্ণ অন্ধকারের কালো। ঠিক তেমনি আমার মনটাও সেদিন ছিল— না পুরো ভাঙা, না সম্পূর্ণ অটুট।

মোবাইলের স্ক্রিনে শেষ যে শব্দদুটি জ্বলজ্বল করছিল, তা ছিল —
“ভালো থেকো।”

দুইটি শব্দ। অথচ তার ভেতরে যেন ছিল হাজারো অপূর্ণ বাক্য, অসংখ্য অশ্রু, আর এক বিশাল নীরবতার আর্তনাদ।


আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল বর্ষার দিনে।
কলেজের করিডোর ভিজে ছিল বৃষ্টির ছাঁটে। সে ছাতা আনেনি, আমিও না। কিন্তু তবুও আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম— যেন আকাশের বৃষ্টিই আমাদের আলাপের সূচনা করে দিল।

সে হেসে বলেছিল,
“আপনি কি সবসময় এমন চুপচাপ থাকেন?”

আমি লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম,
“সবসময় না… মাঝে মাঝে।”

তারপর থেকে আমার প্রতিটি “মাঝে মাঝে” ধীরে ধীরে “সবসময়”-এ বদলে গেল। কারণ সে ছিল আমার প্রতিটি দিনের অভ্যাস, প্রতিটি বিকেলের অপেক্ষা।


ভালোবাসা কবে শুরু হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
হয়তো যেদিন সে অসুস্থ হয়ে কলেজে আসেনি, আর আমি অকারণে সারাদিন অস্থির হয়ে ছিলাম।
হয়তো যেদিন সে আমার দেওয়া বইয়ের পাতায় ছোট্ট করে লিখেছিল —
“তুমি পাশে থাকলে ভালো লাগে।”

ভালোবাসা কখনো ঘোষণা দিয়ে আসে না।
সে আসে নিঃশব্দে, হৃদয়ের অলিন্দে জায়গা করে নেয়।

আমাদের সম্পর্ক ছিল না খুব উচ্চকণ্ঠ।
না ছিল প্রচুর ছবি, না ছিল প্রকাশ্য নাটকীয়তা।
ছিল শুধু নীরব বোঝাপড়া।
সে চোখে চোখ রাখলে আমি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতাম।


কিন্তু ভবিষ্যৎ সবসময় বর্তমানের মতো মৃদু নয়।

সময়ের নিজস্ব এক নির্মমতা আছে।
তার পরিবার অন্য শহরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
চাকরি, দায়িত্ব, সমাজ— সব মিলে তাকে টেনে নিয়ে গেল দূরে।

প্রথমদিকে আমরা বলেছিলাম,
“দূরত্ব কিছু না, মনটাই আসল।”

কিন্তু দূরত্ব কেবল কিলোমিটারে মাপা যায় না।
দূরত্ব জমে ওঠে অপ্রাপ্তিতে, না বলা কথায়, অপ্রকাশিত অভিমানে।

ফোনকল কমে গেল।
মেসেজের উত্তরের সময় বাড়তে লাগল।
কথোপকথনের মাঝে নীরবতা ঢুকে পড়ল।


সেদিন ছিল এক অদ্ভুত বিকেল।
আকাশ মেঘলা, বাতাস ভারী।
আমার মনে হচ্ছিল কিছু একটা শেষ হয়ে আসছে।

হঠাৎ তার মেসেজ এল—
“আমাদের হয়তো এখানেই থামা উচিত।”

আমি অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আঙুল কাঁপছিল, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছিল না।

আমি লিখলাম—
“তুমি কি আর আমাকে ভালোবাসো না?”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর এলো শেষ উত্তর—

“ভালোবাসা আছে… কিন্তু একসাথে থাকা আর সম্ভব নয়। ভালো থেকো।”


“ভালো থেকো”—
এই দুটি শব্দের মধ্যে কত গভীর বিদায় লুকিয়ে থাকে, তা সেদিন বুঝেছিলাম।

সে কি সত্যিই চেয়েছিল আমি ভালো থাকি?
নাকি এই ছিল ভদ্র বিদায়ের আড়াল?

ভালো থাকা কি এত সহজ?
যে মানুষটাকে ঘিরে প্রতিটি সকাল শুরু হতো, প্রতিটি রাত শেষ হতো—
তার অনুপস্থিতিতে কি সত্যিই ভালো থাকা যায়?

সেদিন রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি।
পুরোনো চ্যাটগুলো পড়ছিলাম।
আমাদের প্রথম “হ্যালো”, প্রথম ঝগড়া, প্রথম “মিস ইউ”—
সবকিছু যেন একসাথে ফিরে এসে হৃদয়ে আঘাত করছিল।


দিন কেটে গেল।
আমি ধীরে ধীরে নিজেকে কাজের মাঝে ডুবিয়ে দিলাম।
বন্ধুরা বলল, “সময় সব ঠিক করে দেয়।”

কিন্তু সময় কিছু ঠিক করে না।
সময় শুধু শিখিয়ে দেয় কিভাবে ব্যথা নিয়ে বাঁচতে হয়।

একদিন হঠাৎ বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম—
আমি তাকে আর ঘৃণা করি না।
অভিমানও নেই।
আছে শুধু এক গভীর শূন্যতা।

ভালোবাসা কখনো কখনো শেষ হয়ে যায় না,
শুধু তার রূপ বদলে যায়।
সে হয়ে ওঠে স্মৃতি।
হৃদয়ের এক নিরিবিলি কোণে রাখা এক চিরন্তন ছবি।


অনেক বছর পর, একদিন হঠাৎ সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ছবি দেখলাম।
সে হাসছে। পাশে তার নতুন জীবন।

আমি অবাক হয়ে বুঝলাম—
আমার বুকের ভেতর আর তেমন ঝড় উঠছে না।

হয়তো আমি সত্যিই ভালো আছি।
হয়তো তার সেই শেষ মেসেজটাই ছিল আমার জন্য এক আশীর্বাদ।

“ভালো থেকো”—
সে আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু একই সাথে মুক্তিও দিয়েছিল।


আজও মাঝেমধ্যে সন্ধ্যার আকাশে সেই অদ্ভুত রং দেখি।
মোবাইলের পুরোনো ব্যাকআপে তার মেসেজ রয়ে গেছে।
মুছে ফেলিনি।

কারণ কিছু স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য নয়।
তাদের বয়ে নিয়ে চলার জন্য।

ভালোবাসা সবসময় একসাথে থাকার নাম নয়।
কখনো কখনো ভালোবাসা মানে—
দূরে থেকেও কারো মঙ্গল কামনা করা।

সে বলেছিল, “ভালো থেকো।”
আজ আমি সত্যিই ভালো থাকার চেষ্টা করি।
তার জন্য নয়, নিজের জন্য।

তবুও, গভীর রাতে যখন নীরবতা নেমে আসে,
হৃদয়ের কোনো এক কোণে এখনও প্রতিধ্বনি শোনা যায়—

শেষ মেসেজটা ছিল—
“ভালো থেকো।”

আর সেই দুটি শব্দেই শেষ হয়েছিল এক অধ্যায়,
কিন্তু শেষ হয়নি ভালোবাসা।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *